পৃথিবীর অনেক দেশেই জোরেশোরে বইছে দিন বদলের হাওয়া। পরিবর্তনের শ্লোগান শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের কন্ঠে এখন উচ্চকিত হচ্ছে বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো। তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্হা উন্নয়ণের সুবাদে মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামত প্রকাশ এবং তা আদান প্রদানের সুযোগ অবারিত ও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। তাই আজ না বলা এবং বলা উচিত জরুরী কথাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে ঘরে বসেই। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেকটা স্বাধীনভাবে ও অনায়াসে। গণজাগরনের জন্য এখন বিশেষ কোন বিপ্লবী নেতার প্রয়োজন গৌণ হয়ে গেছে। বিকাশমান মিডিয়া শিল্প ও সাহসী তরুণ প্রজন্মের মিডিয়া কর্মীগণ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
মানুষ পরিবর্তন চায় এবং সংগ্রাম করে জুলুম অত্যাচার নির্যাতন শোষন থেকে মুক্তির জন্য; মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য; দুঃখ কষ্ট গ্লানি থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য; সুশৃংখল স্হিতিশীল ও শান্তিময় জীবন ব্যবস্হার জন্য; সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সুষম ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্হার জন্য; ঘুণে ধরা রাষ্ট্রকাঠামোয় প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা বঞ্চনা দূর্ণীতি দূর করে গণমূখী গতিশীল ও শক্তিশালী জনপ্রশাসন গড়ে তোলার জন্য; ঔপনিবেশিক ধারার কায়েমী স্বার্থবাদী একনায়কতন্ত্র চিরতরে বিদায় করে জ্ঞানভিত্তিক ও গণমূখী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য।
এরূপ পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হয় জনগণের প্রতিবাদী চেতনার উন্মেষ গণজোয়ার ও গণআন্দোলন। তথ্যের অবাধ আদান প্রদান ও সুশীল সমাজের সক্রিয় ভূমিকা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সূচিত হয় দিন বদলের পালা। এদেশে স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঊনান্নব্বইয়ের গণআন্দোলন পতন ঘটিয়েছিল প্রবল ক্ষমতাধর সামরিক জান্তা এরশাদ সরকারের। গণমানুষের প্রবল উৎসাহে এ পরিবর্তন আমরা দেখেছি পরাক্রমশালী আমেরিকায় সুপার এলিট বুশ সরকারের পতন ও কৃষ্ণাঙ্গ ওবামার সরকার গঠণে। দিন বদলের প্রবল আকাঙ্খার প্রতিফলন আমরা দেখলাম ২০০৮ এর জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে শেখ হাসিনার সরকার গঠণের মাঝে। সম্প্রতি তিউনিসিয়া, সুদান, মিশর, জর্দান- এসব রাষ্ট্রে পরিবর্তনের হাওয়া জোরেশোরেই বয়ে যাচ্ছে। জনজীবনে দিন বদলের প্রয়োজন বা কারণগুলো তীব্র হয়ে উঠলেই পরিবর্তনের গণজোয়ার মহাপ্রলয় হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা পাল্টে দেয়। আর যারা তখন ক্ষমতাসীন হন তাদের উপর গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়ে যায় জনগণের ঐসব প্রয়োজন বা কারণগুলো যথাযথভাবে বুঝে নিয়ে দ্রুত সমাধান করা। এজন্যে নতুন সরকারের কাছে অনেক কিছুই সংস্কারের দায়িত্ব এসে যায়। তখনি দেখা দেয় বিপত্তি। রাষ্ট্রকাঠামোয় গেঁড়ে বসা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলো ভেতরে বাইরে থেকে প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সরকার অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে পড়ে অসহায়। এভাবে সময় চলে যায়। আবার একই পরিনতির শিকার হতে হয় তাদের। এদেশে নব্বইয়ের গণঅভ্যূত্থান পরবর্তী সরকারগুলোর ক্ষেত্রে অন্ততঃ তাই দেখা গেল। কোন রাজনৈতিক দলই সরকার গঠণ করে পরপর দুবার ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।
আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্হা ও আইন কানুনগুলো ঔপনিবেশিক ধারা হতে এখনো স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষের উপযোগী করে পরিবর্তন বা সংস্কার করা যায়নি। রাজনৈতিক সরকার যদিও কোনক্ষেত্রে জাতীয় সংসদে যুগোপযোগী আইন পাশ করে দেন; কিন্তু সে আইন যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত বিধি প্রণয়ন ও তা কার্যকর করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি আটকে যায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে। বর্তমান সরকারের প্রবল উৎসাহে এরূপ বহু আইন সংস্কার ও পরিবর্তন করা হয়েছে প্রায় দেড়বছর আগে; কিন্তু এখনো বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়ায় ঐসব আইন কার্যকরতা পায়নি আজো। যেমন, স্হানীয় সরকার উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের জন্য নতুন আইন দেড় বছর আগে জাতীয় সংসদে পাশ করা হলেও উহাদের অধীনে আজো বিধিমালাগুলো প্রণীত হয়নি। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় পুরাতন ধারা আজো বহাল রয়ে গেছে। নাগরিকগণ নতুন আইনের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক সেবামূখী গতিশীল ও শক্তিশালী হতে পারছে না। উপজেলা চেয়ারম্যান ভাইস-চেয়ারম্যানদের সাথে ইউএনও-দের সম্মুখ সমর খোদ ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতকেই হুমকীর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পঁচাত্তুর পরবর্তী নব্বই পর্যন্ত কোন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় না থাকার কারণে মিলিটারী ও সিভিল ব্যুরোক্রেট এলিটরাই মূলতঃ রাষ্ট্র ক্ষমতা পরিচালনা করেন। তাতে করে সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত এ দুশ্রেণীর কায়েমী স্বার্থের প্রতিকূলে যে কোন সংস্কার বা পরিবর্তন ঘটানো নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও স্হানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণের মাধ্যমে শাসনকাজ পরিচালত হবে-সংবিধানের এ বাধ্যবাধকতা ব্যুরোক্রেট এলিটরা আজো মেনে নিতে পারছেন না। উপজেলা চেয়ারম্যানগণ নির্বাচিত হয়েও নানা ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে আজো ক্ষমতহীন। জেলা পরিষদে নির্বাচনের কোন লক্ষণই নেই। আমলাতন্ত্রের প্রতিবন্ধকতার মুখে খোদ সরকারও নীরব ভূমিকা পালন করছে। সে কারণে আমাদের জনপ্রশাসন এখনো ব্রিটিশ বা পাকিস্তানীদের ছেড়ে যাওয়া আদলেই রয়ে গেছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বাহী পদগুলোতে যেসব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আসীন হন তারাও যেন ঔপনিবেশিক শাসকদের প্রেতাত্মা দ্বারা সম্মোহিত হয়ে যান। কেতাদূরস্ত আমলা পরিবেষ্টিত হয়ে নানা কায়দা কানুনের ফাঁদে পড়ে জনগণের কাছ থেকে ক্রমশঃ দূরে চলে যান তারা। সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা ভুলে যান। কৃত্রিম নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে থেকে আমলা বা দাতাগোষ্ঠীর শেখানো বুলি তোতা পাখির মতো আওড়ে যান। অপরদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পেশীশক্তি ও চাঁদাবাজদের দৌড়াত্ম, চাটুকার ও বাকসর্বস্বদের আশ্রয় প্রশ্রয়, দলের ভেতরে গণতন্ত্রহীনতা, সৎ মেধাবী ও সাংগঠনিক প্রজ্ঞাবানদের অবমূল্যায়ণ, মনোনয়ণ বাণিজ্যের মাধ্যমে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের অধক হারে দলে স্হান করে দেয়া-এসব দৈন্যতা আমাদের জাতিসত্ত্বাকে করে কৃষ্ণগহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
স্বাধীনতার এত বছর পরও একই কায়দায় জনগণ রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে শোষণ নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মৌলিক অধিকার বঞ্চণা, শ্রেণী বৈষম্য, আয় বৈষম্য, সেবা ও বিচার লাভের ক্ষেত্রে সুযোগ বৈষম্য-এসব আঘাত ক্রমাগতভাবে মানুষকে হতাশ, নিরাশ, অপরাধপ্রবণ ও বিপথগামী করছে। বাড়ছে সামাজিক অপরাধ ও অস্হিরতা। কারণ দূরীভূত না করে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান ও বাহিনী গড়ে তাদের অবদমিত করা বা বিনা বিচারে হত্যা করার সংস্কৃতি জাতিকে স্বস্তি দেয়ার পরিবর্তে ভয়ানক পরিস্হিতির দিকে ঠেলে দিবে। অন্ততঃ পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। পুঁজিপতি, আমলা ও রাজনৈতিক শক্তি মিলে কর্পোরেট ক্রাইম করে দেশের অর্থ বিত্ত তাদের আয়ত্ত্বে নিয়ে অস্বাভাবিক ভোগবিলাসে মেতে উঠে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। বিশাল জনগোষ্ঠী যেখানে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর, পয়সার অভাবে শিক্ষা চিকিৎসা বাসস্হান পাচ্ছে না, শিক্ষিত বেকার যুবকরা কাজের সুযোগ পাচ্ছে না সেখানে তাদের সামনে দিয়ে ঐসব বিত্তবান সুযোগ সন্ধানীরা কোটি টাকা মূল্যের গাড়ী হাঁকাচ্ছে। এসব দৃশ্যের প্রতিকৃয়া সন্ত্রাস ছাড়া সমাজকে আর কী-ই-বা উপহার দিতে পারে? পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটণার অন্তর্ণিহিত কারণের মাঝে প্রধান যে দুটো ক্ষোভের কথা বিডিআর সদস্যদের কন্ঠ হতে আমাদের কর্ণ স্পর্শ করেছে তা হলো-(১) ভিন্ন সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ডেপুটেশনে বা প্রেষণে নিয়োগ অর্থাৎ আর্মি অফিসারদের বিডিআর এ ডেপুটেশন প্রথায় পদায়ণ এবং (২) বাহিনীতে কর্মরত কর্মকর্তাদের সাথে সাধারণ সৈনিকদের বেতনভাতা ও সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিস্তর বৈষম্য। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে একই অবস্হা বিদ্যমান। জাতীয় বেতন কাঠামোয় ২০টি স্তর আজো টিকিয়ে রাখা হয়েছে যা সাংবিধানিক মূলনীতি সমর্থন করে না। এ বৈষম্য কার স্বার্থে? জাতির জনক বেতনস্কেলের এ স্তর ১০টিতে নামিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর কায়েমী স্বার্থবাদী সিভিল ও মিলিটারী এলিটরা তাদের ব্যুরোক্রেসী মজবুত রাখার স্বার্থে পূণরায় বেতনস্কেলের ২০টি স্তর বহাল করে উৎকট শ্রেণী বৈষম্য টিকিয়ে রাখেন। এছাড়া সরকারী চাকুরীতে গেজেটেড নন-গেজেটেড, ক্যাডার নন-ক্যাডার ইত্যাদি পার্থক্যের দেয়াল টেনে বৈষম্য কায়েম করা হয়েছে। রাষ্ট্রের চাকুরী কাঠামোয় সুবিধা ও লাভজনক সবগুলো পদই তারা দখল করে থাকেন এমনকি তা ভিন্ন সার্ভিসের হলেও। এজন্যেই ডেপুটেশন প্রথার প্রবর্তন। দেশে এতো উচ্চ শিক্ষিত বেকার। তারা চাকুরী পাচ্ছে না; অথচ বিভিন্ন সার্ভিসে যোগ্য কর্মকর্তার অভাবের অজুহাত দেখিয়ে তারা ঐসব পদে প্রেষণে পদায়ণ পাচ্ছেন। এহেন কায়েমী স্বার্থ টিকিয়ে রাখার ফলে বিভিন্ন সার্ভিস সেক্টরে প্রচন্ড ক্ষোভ দিন দিন দানা বাঁধছে।
দেশে গণমানুষের স্বার্থ ও আকাঙ্খা অভিপ্রায়কে অবহেলা করে কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া হলে তা হবে যে কোন সরকারের জন্য আত্মঘাতী কাজ। যারা জনগণের শ্রম, অর্থ ও সমর্থনের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে শুধু পরজীবি হয়েই বেঁচে থাকতে চান তাদের সময় ফুঁরিয়ে এসেছে। সব তন্তর মন্তর এখন অচল। ইন্টারনেট আর মোবাইল ফোনের এ যুগে তারুণ্যের প্রতিভা দূর্বার দূর্বিণীত। সময় থাকতে দেশের রাজনৈতিক সরকার জনগণকে সাথে নিয়ে এ তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দিন বদলের সবগুলো কাজই সেরে নিতে পারেন। জনগণের কাঙ্খিত পরিবর্তনের পথে দৃশ্য অদৃশ্য কোন শক্তিই তখন প্রতিবন্ধক হয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারবে না। কাকে বিশ্বাস করবেন তা এখনই ঠিক করুন। তা না হলে জনমূখী কল্যাণ রাষ্ট্র গঠণের জন্য যা যা সংস্কার বা পরিবর্তন যেখানে যেখানে প্রয়োজন-একদিন হয়তো জনগণ নিজের হাতেই করে নেবে।
0 comments:
Post a Comment